ঐতিহাসিক কবিতা | ১৬ই ডিসেম্বর ২০০৫ ইং

স্বাধীনতা

প্রতিবাদী কণ্ঠ দাবি আদায়ে যত কথা বলছিল,
তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানে তত বিপ্লব চলছিল।
আন্দোলনমুখী রাজনৈতিক ধারা ছিল প্রবহমান,
ঘনঘন কারাবরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
স্বৈরাচারী আইয়ুবের একনায়কতান্ত্রিক প্রশাসন,
বিক্ষুব্ধ বীর ছাত্র-জনতার অসহযোগ আন্দোলন।
৬৬-তে গণআন্দোলন ছয় দফায় বাংলা ওঠে জ্বলে,
৬৯-এ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুজিব জেলে।
জেলের তালা ভেঙে মুজিবকে আনতে ছিনিয়ে,
একতা হলো জনতা, আগুন ঝরা ছড়া-গান গেয়ে।
জনতার স্রোতে ৭০-এ সাধারণ নির্বাচন দিয়ে,
বাধ্য হলো আইয়ুবশাহী মুজিবের ৬ দফা মেনে নিয়ে।
জেলের পাখি বাংলার মহানায়ক এবার মুক্ত,
পূর্ব পাকিস্তানে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র জ্বলন্ত উত্তপ্ত।
মুক্তি যেন দিল জনতার দায়িত্ব মুজিবের কাঁধে,
এবার চষে বেড়ান কৃষক-শ্রমিকের বাংলায় চাষাবাদে।
নতুন চালে ইয়াহিয়াকে গোপনে দায়িত্বে বসিয়ে,
আইয়ুব বিদায় নিলেন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে।
নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের নিরঙ্কুশ হলো বিজয়,
মুজিব বাংলা-বাঙালির ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবপ্রাপ্ত হয়।
ক্ষমতার মোহে ইয়াহিয়া-ভুট্টো পশ্চিমা প্রশাসন,
হস্তান্তর করতে ক্ষমতা করে শুধু কালক্ষেপণ।
ক্রমেই উত্তাল উত্তেজনা রাজনৈতিক অঙ্গন,
আলোচনায় মত্ত রেখে পাকি’রা করে বিশ্বাস ভঙ্গন।
সেনা রদবদল ঘটায় সংগোপন পরিকল্পনায়,
নীলনকশা আঁটে বাঙালি নিধনে দৈত্য চেতনায়।
জাতির ক্রান্তিলগ্নে ঘটে ঐতিহাসিক মহামিলন,
মহান নেতা আর তাঁর লক্ষ জনতার মহাসম্মেলন।
সেই জনতার মঞ্চে কাব্যিক সেই মহা-ভাষণ,
ভিত কাঁপিয়ে তুলল ইয়াহিয়ার ভঙ্গুর প্রশাসন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” “তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো...” “মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।”
১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ভ্রূণ হলো,
২৬শে মার্চ সেই বজ্রকণ্ঠের চূড়ান্ত যুদ্ধের ঘোষণা পেল।
বঙ্গবন্ধুর টেলিগ্রাফিক মুদ্রিত ঘোষণা-পত্র খানা,
২৫শে মার্চ রাতে প্রথম পেল ইপিআরের পিলখানা।
পর্যায়ক্রমে ঘোষণা পত্র পঠিত হয় উৎকণ্ঠে,
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কালুরঘাটে মেজর জিয়ার কণ্ঠে।
মহানায়ক সকলকে হুকুম দিয়ে প্রজ্ঞাচিন্তায়,
গভীর রাতে জিম্মি হলেন সমর-জান্তার হাতে।
বঙ্গবন্ধু জানালেন যেন আমার জীবনের বিনিময়ে,
রাজনৈতিক অধিকার পেয়ে সাম্রাজ্যবাদ মুক্ত হয়।
সেই ডাকে বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা স্বাধীনচেতা,
শ্রেণি-পেশা জনতা গড়ে তোলে প্রতিরোধ একতা।
মুজিবনগরের আম্রকাননে গড়ে অস্থায়ী সরকার,
দেশ মাতৃকার মুক্তি চেতনায় উদ্বুদ্ধ সবে একাকার।
স্বেচ্ছায় যার যা আছে তা নিয়ে আপনার তরে,
চলে আর যা নেই তার জন্য কালবিলম্ব না করে।
জান-মাল কোরবানি দিতে সর্বদা প্রস্তুত,
সত্যাগ্রহে সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতায় জাগ্রত।
গুলির শব্দ আগুন রক্ত মৃত্যু যন্ত্রণা হাতে,
বুটের পদভরে মেঠো পথ হতে ভরা রাজপথে।
লক্ষ লক্ষ আবালবৃদ্ধবনিতার আত্মহুতি,
অগণিত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কত ক্ষয়ক্ষতি।
এই ভাবে দশটি মাস অতিবাহিত হয়ে,
দেশি কুকুরের বাঁকা লেজ সোজা করে বয়ে—
১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে,
বিজয় দিবস ঘোষিত হলো এক মহাসন্ধিক্ষণে।
১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট বর্বরোচিত ঘটনায়,
স্থপতি দেশের জনক সপরিবারে হয় চিরবিদায়।
সত্য-সুন্দরের কবর রচিত করে যেই সর্বনাশা,
সেই অবাধ্য সন্তানদের এমনই হয় করুণ দশা।
অশুভ শক্তির বিষাক্ত থাবায় ভরা বর্বরতা,
জয় বাংলা আজ বিমূর্ত, পরাজিত স্বাধীনতা।
কী শপথ ছিল সেদিনের সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে?
মুক্তিবাহিনীর জয়ধ্বনি শুধুই কেঁদে ফেরে।
জীবিত মুক্তিযোদ্ধা আজ ওরা জীবন্ত মৃত,
জীবন যুদ্ধে পরাজিত সেদিনের সাহসী বীর যত।
খুঁজে ফেরে প্রশ্ন ছুড়ে সবার দ্বারে দ্বারে,
বাংলার নিভৃত পল্লী থেকে অত্যাধুনিক শহরে—
“কুকুরের লেজ কেন সোজা থাকে না সহসা?”
কত শত শহীদের আত্মার অমোঘ জিজ্ঞাসা।
পরাধীন কেন আজও বাংলার স্বাধীনতা?
কণ্ঠ রুদ্ধ ভাষা বেদনাহত নয়নে অশ্রুসিক্ততা।
এত বছরেও করে না অর্জন স্বনির্ভরতা,
রুগ্ণ কেন সোনার বাংলার সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতা?
সত্যের প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া,
বদান্যতা তব নিত্য শাস্তি পাওয়া স্বাধীনতা।
— কাজী আব্দুস সালাম