রাজনৈতিক প্রতিবাদী কবিতা | ০৭/০৯/২০০২ ইং

আমাদের সুখের জন্য

আমাদের সুখের জন্য; আমাদের সেবার জন্য;
(কে,বি,এইচ,এস, গুলশান, ঢাকা।)
তোমাদের সুখের জন্য আমাদের সন্তানদের বাড়তে হয় অপূর্ণাঙ্গভাবে,
পড়াশোনা ফেলে কাজ করতে হয় অপরিণত বয়সে।
তোমাদের সুখের জন্য কড়া মূল্য দিতে হয় আমাদের—
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা আর শিক্ষার ক্ষেত্রে।
আর তোমাদের সন্তানদের শিক্ষা ও মৌলিক চাহিদা মেটানো হয় বিদেশে,
অনেকেরই অবৈধ অর্থ ব্যয়ে সলিল ও অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে।
তোমাদের সুখের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে
আমাদের সাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়,
আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি বারবার হোঁচট খেয়ে পড়তে।
আমাদের সেবার দায়িত্ব নিয়ে উল্টো আমাদের দিয়েই সেবা করিয়ে নাও তোমরা।
আমাদের সেবার জন্য আমাদের খেয়ে, আমাদের পরে,
আমাদেরই ভয় দেখানো হয়; নির্লজ্জভাবে চলে নির্যাতন, শাসন ও শোষণ।
অবৈধ অর্থে সন্ত্রাস লালন করো আর বক্তৃতায় বলো উন্নয়নের বুলি,
ভুয়া প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ করো আর রাজনীতিকে পেশা বানিয়ে কালো টাকা সাদা করো বাজেটে।
তোমাদের সুখের জন্য উচ্চ হারে ভ্যাট আর কর চাপাও,
এটি কি গণতন্ত্র নাকি রাজ-পরিবারতন্ত্র?
স্বাধীন বাংলায় এ যেন ব্রিটিশ শাসন— নীল চাষের মতো ছাগলের চাষ!
বুয়েট আর শামসুন্নাহার হলের সেই বীভৎস দৃশ্য আমাদের অবিরত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
তোমাদের সুখের জন্য আমরা ধন্য হই সেবা দিয়ে,
আমাদের সন্তানরা মরে, আর মরে যাওয়ার পরেও সেই দুঃখ-বেদনা জানাতে
আমরা যাই তোমাদেরই ঘরে।
আমাদের সেবার জন্য স্বাধীনতার ঘোষক আর শহীদের উদয় হলো একুশ বছর পরে,
রাজকীয় পেশাদার চামচাদের অতি উৎসাহে!
জিজ্ঞাস্য ঐ মূর্খদের কাছে— শহীদের সংজ্ঞা কী?
ঘোষক আর শহীদ কি কেনাবেচা হয় রাজনীতির বাজারে?
ঘোষণা পত্র পাঠ করলেই কি কেউ ঘোষক হয়ে যায়? ইতিহাস বিকৃতি কেন?
ধিক তোমাদের হে জ্ঞানপাপীগণ!
স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পরেও এ দেশে এমন মানুষ আছে যারা বলে—
“বেতন খাবে তোমরা আর লেখাপড়া করব আমরা, তা হবে না, তা হবে না।”
আমার এই সোনার বাংলা এক উর্বর মূর্খের ভূমিও বটে।
তোমাদের সুখের জন্য ইসলামের নামাবলি পড়ে পীর সেজে চাঁদাবাজি দিব্যি চলে,
কে করবে এর প্রতিবাদ? সামগ্রিকভাবে শিক্ষার অভাবে মূর্খরা সন্ত্রাসী করে চাঁদা তোলে,
ধর্মের নামে মিথ্যে ভয় দেখিয়ে। টিকেট ছাপিয়ে ইসলামী জিম্মাদার সেজে বাপ-দাদার নাম করে লুটপাট চলে।
ঘরে খাবার চাল নেই, তবুও পরকালের নাজাতের আশায় অশিক্ষিত সরল মানুষ ধার-দেনা করে পীর হুজুরের হাতে টাকা তুলে দেয়।
মুখোশ পরে গোঁড়ামির হাল ধরে এরা মূর্খের বীজ বপন করে রাজনীতির নামে।
সুন্দরীর সম্মুখে হুজুররাও পরাহতো; সে এক অদ্ভুত পরাজিতের ভাব!
এরা ইসলামের ভুয়া নামে ভাঙা খেয়া চালায়। লম্পট, জেনাখোর আর চাঁদাবাজদেরই নামকরণ করা হয়েছে “আধুনিক মুসলমান”।
তোমাদের মুখে শুনি বিবৃতির মালা আর অজুহাতের ছড়াছড়ি,
মিথ্যে সভা আর জাঁকজমকপূর্ণ উত্তেজনা নিয়ে চলে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি।
ক্ষমতার বাইরে থাকলে তোমাদের হাড়-চামড়ায় কথা কয়, তখন জনগনই হয় ক্ষমতার উৎস!
ক্ষমতায় এলেই তোমাদের হাড় আর চামড়ার দূরত্ব বেড়ে যায়— মাঝে তৈরি হয় লাল মাংস,
গর্দানের গোশত বেড়ে যায়, গাল হয় তুলতুলে। আর সে মোহে আমাদের ভুলে যাও তোমরা।
আমাদের সেবার জন্য ম্যান্ডেট নিয়েছিলে, ভোট নিয়েছিলে,
কই, আর তো এলে না সেই ওয়াদা বাস্তবায়নে? ভোল পাল্টে সেবার খাইয়েছ ডাল-ভাত,
এবার খাওয়াচ্ছ ছাগলের মাংস! গমে পোকা থাকলেও তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সব ঠিক!
দুর্নিতির সার্টিফিকেট পেয়েছো অনেকজন, পেশাজীবী রাজনৈতিক চিহ্নিত হয়েছ তোমরা,
বুকে হাত দিয়ে কি বলতে পারবে একজনও সম্পদ গড়েছো সৎ উপায়ে? তোমাদের সেবার জন্য আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছো, আর তোমাদেরই ঘরে গিয়ে বলছি—
বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তোমাদের ঝেঁটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন “বাকশাল” দিয়ে, ফলে তাঁর নিজেকে পরিবারসহ বিদায় নিতে হয় তাতে;
আর এক অকুতোভয় পেশাদার ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার দেশের দুঃসময়ের মাঝি, সময়ের উন্নয়ন কর্মসূচির কান্ডারী সেনাপতি বলেছিলেন—
“আজ থেকে পেশাজীবী রাজনীতির দিন শেষ।”
অতঃপর ক’দিনের মধ্যে তাঁকেও হয় বিদায় নিতে। তা কোন সে ইশারায়?
তারপরেও তোমরা যথাবস্থায় আছ। আমাদের লজ্জা হয় তোমাদের পর্যালোচনা করতে,
তোমাদের লজ্জা নেই বলে আমাদের আরও বেশি লজ্জা পেতে হয়।
জনগণের রক্ত-মাংসে গড়া শরীর নিয়ে তোমরা জনগণের চাকর নও, সেবক নও,
হয়েছ স্বৈরশাসক! মুখে গণতন্ত্রের বুলি আর একে অন্যকে গালি—
তোমাদের গালি শুনে আমাদের লজ্জা হয়। শরমে-মর্মে আমরা মর্মাহত,
তবুও লিখতে হয় কাগজে, শুধু যবনিকার আশায়।
— কাজী আব্দুস সালাম